একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখল যে সে একটি দেশপ্রেমী বাইকে পরিণত হয়েছে। সে আর কোনও কার্বন হাইড্রোজেন সালফারে নির্মিত মানবশরীর নয়, বরং ইতিহাসের যুদ্ধাস্ত্রের ধাতব যন্ত্রাংশ গলিয়ে বানানো একটি দুচাকার যান, যার গা দিয়ে ভর ভর করে বেরিয়ে আসছে তীব্র রাষ্ট্রপ্রেম ও সুচারু পন্যায়নের সম্মিলিত ককটেলের সুবাস। এদেশের বুকে, সীমান্তে ও নানা স্থানে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, মিডিয়া কভারেজ, সোশ্যাল মিডিয়া হুজ্জুতি এবং সর্বোপরি টি.ভি. অ্যাড এর দৌলতে সে জেনে গিয়েছে নিশ্চিন্তে টিকে যাওয়ার নির্ভুল মন্ত্র, হাইপ। নেশাগ্রস্ত সময়ের হুজুগনির্ভর মার্কেটকে পাকড়াও করে নিজের ট্যাঁকে কয়েকটি সুদৃশ্য গান্ধীচিত্র ভরে নিলেই কেল্লাফতে। অতএব হিরো হোন্ডা থেকে বাজাজ, চুলের তেল থেকে হজমলা, চালাও তেরঙ্গা-আর্মি-স্যালুট-সুড়সুড়ির বিক্রি, আসল দেশকে পরিপাটি ধামাচাপা রেখে নকল দেশের ডেমো বানিয়ে তার গায়ে একের পর এক প্রোডাক্ট তুললেই পাওয়া যাবে দেশপ্রেমের ছাপ, বিক্রি আর রোখে কে? এহেন পেড নিউজ শোভিত সময়ে, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত নিশ্চিন্ত বেডরুমে রাতের হালকা ডিনার সেরে নয়ালব্ধ ফ্রি হাই স্পিড ইন্টারনেটে ফেসবুক ও যাবতীয় সোশ্যাল মাধ্যমে দেশপ্রেম ওগরাতে ওগরাতে যদি আমাদের গ্রেগর সামসা দেখে ফেলে মালকানগিরিতে সাতাশজন আদিবাসীর মৃত্যু? তার পৈশাচিক আনন্দই হবে। কারণ আমরা জানি, ওইসব অঞ্চলে মাওবাদীদের আখড়া আছে, এবং পাকিস্তানের নাতনির বিয়েতে গিফট পাঠানো গেলেও কালোকুলো গ্রেটেস্ট ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেটদের সাথে নো ডায়লগ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, উরি হামলা বা সারজিকাল স্ট্রাইক নিয়ে দেশ জুড়ে মিডিয়াতে যে বিপুল হইচই হয়, দেশের অভ্যন্তরে একইরকম সাফল্যে ইতনা সন্‌নাটা কিউ হ্যাঁয় ভাই? সান্ধ্য আড্ডায় পাউডার মাখা বাবুদের সভায় তর্কের ঝড় ওঠেনা কেন? অর্ণব গোস্বামীর নেশন কি জানতে চায়না এমন সুখবর, এত বড় অ্যাচিভমেন্ট? সাতাশটি মৃতদেহ থেকে একটুও মুনাফা লুটবো না আমরা? কেন?

najeeb

এরকমই আরেকটি খবর কোথাও পচা মৃতদেহের মতও ভেসে ওঠেনা, কয়েকজন হাতে গোনা ফেসবুক অ্যাকটিভিস্টদের দেওয়াল ছাড়া। জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহি-মান্ডভি হোস্টেল থেকে নাজিব আহমেদ নামক এক বায়োটেকনোলজি ছাত্রের রহস্যজনক উবে যাওয়ার ঘটনায় আমাদের তামাম সুশীল সমাজ চুপ। এবং এখান থেকেও মুনাফার অঙ্ক স্পষ্ট, কিন্তু তা পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। চোদ্দ অক্টোবরের রাত্রে এবিভিপির কিছু কর্মীর সাথে হাতাহাতি, মাকে ফোন করে দেখতে চাওয়া, পরদিন ভাই বোনসহ মা বাসস্ট্যান্ডে এসে গেলে তাদের নিজের কাছে চলে আসতে বলা – এরকমই কয়েকটি ধোঁয়াটে দৃশ্যপটের ভিতর গায়েব হয়ে যান নাজিব আহমেদ। যেহেতু আমরা নাম পদবী দেখেই ধরতে পারছি তিনি মুসলিম, এবং সরল যুক্তিতে জিহাদি, সর্বোপরি এবিভিপির সাথে লড়াই করেছেন মানে দেশদ্রোহীও বটে, অতএব তার হাল হকিকত বিষয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কিছু নকশালপন্থী সংগঠন দাবি করেছে এ নাকি দেশপ্রেমীদের কাজ, তাই বিপক্ষের ন্যারেটিভ খাড়া করার স্বার্থে উল্টে নকশালরাই লুকিয়ে রেখে নাটক করছে বলা ছাড়াও পরম মমতাময় রাষ্ট্রের কাছে আমরা এটুকু দাবি কি জানাবো না, যে অন্তত একটা পাতি জিহাদি মেরে হাত গন্ধ করার দরকার আমাদের নেই, এবং তা প্রমাণ করার স্বার্থেও রাষ্ট্রের উচিৎ নাজিব আহমেদকে যেভাবেই হোক খুঁজে বার করে হাজির করা। আমরা মিটিং মিছিল ঘেরাওয়ের খবর পাচ্ছি, আরও জানতে পারছি দুটি মূলধারার সংসদীয় বামদলের আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে ইন্টারনাল কনফ্লিক্ট, ন্যাশনাল ও অ্যান্টিন্যাশনাল যাবতীয় ভ্যান্তারাও মার্কেটে আগতপ্রায় কিন্তু আসল বিষয় অর্থাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্রের কর্তব্য ও এই ক্ষেত্রে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কোনও জ্ঞানগর্ভ বয়ান আমাদের নজরে আসছে না। আর যারা আশা রাখছেন মুল ধারার একটি বামদল এই ব্যপারে বিশাল কিছু একটা করে উঠতে পারবে, তাদের উদ্দেশ্যে আরেকটি অপ্রসঙ্গের অবতারণা এই বেলা করেই যাই।

jnu-missing-student-protest-759

তিরানব্বই এর শীতের রাতে নির্দিষ্ট স্বার্থের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া হুগলীর ভিক্টোরিয়া জুটমিলের এক শ্রমিককে তুলে নিয়ে যায়  পুলিশ। তারপর থেকে সেই ব্যক্তিও গায়েব হয়ে যান। তার  নাম ভিখারি পাসোয়ান। কোর্টের জারি করা “হেবিয়াস করপাস” মামলায় রাষ্ট্র তার পুলিশকে খুব স্বাভাবিকভাবেই ডিফেন্ড করে এবং পরে সিবিআই পুলিশকে সরাসরি অভিযুক্ত করলে বিচারব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করে অভিযুক্ত পুলিশকে সকল প্রমোশান ও পদকের ব্যবস্থা করে দেন একটি বিশেষ বামদল পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা যাদের ছাত্র সংগঠন বর্তমানে জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া নাজিব আহমেদ এর ব্যপারে প্রতিষ্ঠানিক অনীহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পথ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।

তাদের পথ তারা বার করুক, কিন্তু আমরা যারা রোজ টিভিতে শিখছি আর্মি দেখলে স্যালুট করতে হয়, হাজারবার মাদারচোদ বললেও, তাদের উচিৎ এই ব্যপারে সম্মিলিত ভাবে প্রশ্ন তোলা। ইউনিভার্সিটি, তা সে যতই স্বশাসিত হোক, যেহেতু তা রাষ্ট্রের টাকায় চলে, তাই সে রাষ্ট্রেরই প্রতিভূ (বং শিক্ষামন্ত্রী পার্থবাবুর “বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন” নামক পেপার দ্রষ্টব্য)। এহেন একটি প্রতিষ্ঠান এমন গর্হিত ব্যপারে অবহেলা করে রাষ্ট্রের নাম ডোবায় কীভাবে? নাজিবের মাকে পরামর্শ না দিয়ে তার কি উচিৎ ছিল না নিজেই “হেবিয়াস করপাস” ফাইল করে যেভাবে হোক নাজিবকে উদ্ধার করে চীনাপন্থী নকশালদের হাঁড়ি হাটের মাঝে ফাটিয়ে দেওয়া? আরও মূল্যবান বিশেষ একটি দেশপ্রেমী সংগঠনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তর ব্যবস্থা করা? তা না করে এই চু কিতকিত খেলায় কার কী লাভ হল সেটা উপাচার্য মশাই জানাতে পারবেন? নাকি কানাইয়া কুমারের মত ভুগর্ভস্থ একটি দল থেকে ভুঁইফোড় নতুন আরেকটি নেতা  তুলে আনাই তার অভিসন্ধি? প্রশ্ন করুন, প্রশ্ন করা প্র্যাকটিস করুন। মান্যবর বলেছেন সব জায়গায় দেশপ্রেমিক উপাচার্য বসানো হবে বলেই সবাই যে সত্যিই তাই তেমন নাও হতে পারে।

lead-najeeb

ফলত এক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা জরুরি, যেমন জরুরি ছিল কিংবদন্তি “হোক কলরব”এর ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগেই কলরবের দুই বছরের জন্মদিন হয়ে গেলো, আমরা মানে ননএলিট আম আদমি আজো জানিনা সেই মেয়েটি এবং মলেস্টারের কী হল? ঠিক কোন পথে এগোল তদন্ত ও বিচার? আমাদের বিপ্লবীকুল দরকারে এবং অদরকারে নিজেদেরকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সদাউচ্চশির এক শক্তি মনে করলেও সমাজ যা সম্পূর্ণই মানুষ দ্বারা তৈরি, যারা রোজ কাগজে টিভিতে খবর দেখে তাদেরকে সব কিছু জানানোর ভদ্রতাটুকু তাঁরা করে উঠতে পারেন না (দায়বদ্ধতা অনেক জটিল শব্দ বাবুমশায়)। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হওয়ার সুবাদে জাতীয় ও বিজাতীয় সকল গণমাধ্যমের ফুটেজের গুড়টুকু খেয়েই তাঁরা রণে ভঙ্গ দিয়ে দেন। ফলে, হয়তো, এই কারণেই তাঁরা ক্যাম্পাসবিপ্লবীই থেকে যান (সবাই নন, কারণ পলিটিকাল কারেক্ট কথা না বললে ফ্যাসিবিরোধিতার পরাকাষ্ঠারাও কতটা ফ্যাসি হয়ে ওঠেন তা নিয়ে চাপ আছে), কাশ্মীরের পক্ষে গজানো হাই আর্ট, স্লোগান কীভাবে নিরাপদ আদুরে দ্রোহকল্পনার বস্তু হয়ে ওঠে এবং প্রশ্ন করলে তার শিল্পক্ষমতা, কাব্যিকতা প্রভৃতি দাঁতভাঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করে বুঝিয়ে দিতে হয় “আমরা অমুক, আমরা হাত দিলেই সে কাজ কম করে আইজেন্সটাইন বা পুদভকিনের নীচে হয় না”। তবে ঋত্বিকের ছবিকে ব্যবহার করে নিকারাগুয়ার বা ইউক্রেনের সমস্যা নিয়ে কলকাতার রাস্তায় সারিয়াল ছবিকরিয়ে বা সাহিত্যসেবক এবং আর্ট ফর আর্ট সেকের ছুপা দালালদের আর কোনও প্রশ্ন করেই কোনও লাভ নেই। সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি মানুষের অভাব, মানুষের সমস্যার আগে আমার নিজেকে কিছু প্রমাণ করার মরিয়া তাগিদ। কেউ দেশপ্রেম, কেউ বিপ্লব, কেউ আর্ট করুক দিনের শেষে মানুষ হারিয়ে যাক। যারা মানুষে বিশ্বাস করেনা প্রতীকে করে এবং যারা মানুষে বিশ্বাস করে বলে দাবি করতো, উভয়পক্ষই আজ দুটি মডেল বানিয়ে ফেলেছে। দেশপ্রেম ও বিপ্লবের মডেল। এবং তার সাথে কেনাবেচার সম্পর্ক আগেই অন্য ছলে বলে ফেলা হয়েছে। কিন্তু মানুষ না থাকলে প্রশ্ন করবে কে? জীবন সমস্যায় জর্জরিত মানুষ হাতে প্রশ্নের ঢিল তুলে না নিলে কাঁচবাক্সের ম্যানিকুইন কে রাস্তায় নামিয়ে উলঙ্গ করবে কে?

আমাদের জানতে হবে নাজিব কোথায়। কে তাকে কেন লুকিয়েছে, বিপ্লবের পথ, দেশপ্রেমী দেশদ্রোহী যাবতীয় আলোচনার আগেই আমাদের মানুষ নাজিবের খবর নিতে হবে। নাজিব আমার সহনাগরিক, তার ভাল খারাপের খবর জানার অধিকার আমার আছে। রাষ্ট্রের যেমন কর্তব্য সমস্ত আইনি পদক্ষেপ নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে উদ্ধার করা তেমনি আন্দোলনকারীদেরও দায়িত্ব তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে, বিপ্লবের স্বার্থে নয় নাজিবের স্বার্থে, তা আমাদের জানানো। নইলে চার দেওয়ালের সমস্যা চার দেওয়ালেই থাকবে, আর আগ্রাসী প্রোপাগান্ডার সহজলভ্য আফিম খেয়ে মোহিত মানুষ দূরে আরও দূরে চলে যাবে, কুঁকড়ে যাবে। শুধু পড়ে থাকবে দুটো যুযুধান ম্যানিকুইন।

sayantan-mitra

সায়ন্তন মিত্র রাজনীতি সচেতন হবু ডাক্তার , বিনয় মজুমদারের কবিতা ভালবাসেন । ফেসবুকে ইনিয়েস্তা পদবি ব্যবহার করেন ক্যামোফ্লেজ অথবা ফুটবলপ্রেমের কারণে। ইমেইল : sayantansvoice21@gmail.com

The views and opinions expressed in this article are those of the authors and do not necessarily reflect the official policy or position of “Desher Agamikal”.  The writers are solely responsible for any claims arising out of the contents of this article.

Previous post

কাশ্মীর - মানবিক / অমানবিক সৌম্য মণ্ডল

Next post

ফেস্টিভ্যাল ক্রমে আসিতেছে, গাইডবুক সঙ্গে রাখুন - অরূপরতন সমাজদার

দেশের আগামীকাল

দেশের আগামীকাল

আগামীকাল : লোকাল-গ্লোবাল- ন্যাশানাল এবং বলা বাহুল্য, র‍্যাশনাল। ইন্ডিপেনডেন্ট মেজাজ, অল্টারনেটিভ সাজ। পোস্টমডার্ন ভাব, শান্ত স্বভাব। একবার পড়লে ভাবতে হবে আবার পড়তে এবং ভাবতে হবে । পড়া আর ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে।

No Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *