gulag

 

আমার বয়স তখন ১৩। বাবা  একটা ক্যালেন্ডার কোথা থেকে পেয়ে দেয়ালে ঝুলিয়েছেন, তাতে নানা বিখ্যাত লেখকের বিশেষ মুহূর্তের ছবি।  পশ্চিমের কোন একটি দেশের গুণী মানুষের মাঝে রবীন্দ্রনাথের ছবিও ছিল। একটা ছবিতে আমার চোখ পড়ল যেটা আমার সদ্য পড়া রুশদেশের বিপ্লবের গল্পের সঙ্গে মেলে না। আধা সন্ন্যাসীর মতো দেখতে এক পুরুষ, পরনে লম্বা কোট, এক কম বয়েসি মহিলাকে জড়িয়ে ধরে আছেন, মহিলার কোলে দুটো শিশু। নিচে লেখা, novelist solzhenitsyn meets his wife in exile. ভাবলাম এক্সাইল! সে তো লেনিন ও স্তালিনকে যেতে হয়েছিল!! সলঝিনিতসিন কোন সময়ের লেখক? পেছনে প্লেন বা এমন কিছু ছিল যাতে আমার মনে হল, যে,  না, এ ছবি ১৯১৭ সালের আগের।  বাবাকে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করাতে উনি নিরুত্তর রইলেন। বাবা আমার বন্ধুর মতো ছিলেন। তাঁর এই আচরণ অদ্ভুত লাগল। ক’দিন পর আবার ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে সেই ছবিটা দেখতে গিয়ে দেখি পাতাটা নেই!! মাকে ব্যাপারটা বলাতে  মা জানাল, ওটা বাবা ছিঁড়ে দিয়েছে। সেটা ছিল সাল ১৯৮০।

রুশ দেশের মহান বিপ্লবের গপ্পটা আমার কাছে ওই বয়সেই শেষ হয়ে গেলেও আলেকজান্দার  সলঝিনিতসিনের (১৯১৮ – ২০০৮)  কাছে ওই বয়সে হয়নি, তাকে সে সত্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেক ব্যক্তিগত যন্ত্রণার মধ্যে।রাস্ট্র আমাদের অর্থনীতি আর আইনের শাসনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না, ব্যক্তির জীবন, তার অস্তিত্বের পরতে পরতে প্রবেশ করে, রাজনীতি হয়ে ওঠে মানুষের চেয়ে বড়, এক দানবের আকার নিয়ে ফেলে। তাকে পরাজিত করার পথ শিল্প নয়, প্রেম নয়, আধ্যাত্বিকতা নয়, কোন কিছুতেই পাওয়া যায় না আর। সলঝিনিতসিনের ব্যক্তি জীবন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাঁর সাহিত্য, খানিক অভিজ্ঞতা, খানিক কল্পনা, নানা সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা, লোকশ্রুতি, আমার কাছে দস্তয়েভস্কির পর এত বড় ঔপন্যাসিক রুশ দেশে জন্মাননি,  গোর্কি, সলোকভ বা বুলগাকভের কথা মাথায় রেখেই বলছি।  সলঝিনিতসিনের  জীবন তাঁর উপন্যাসের ট্র্যাজেডিকে ছাপিয়ে গেছে।

One day in the_life of I D

 

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম সলঝিনিতসিনের, বাবা তাঁর জন্মের আগেই মারা যান, পাখি শিকার করতে গিয়ে ফ্রিক এক্সিডেন্টে, রুশ বিপ্লবের সামান্য পরে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মাবার অপরাধে, পারিবারিক ভাবে খৃষ্টীয় চেতনায় মানুষ হবার অপরাধে নয়া সমাজতান্ত্রিক, সর্বহারা সমাজে খানিক অপাঙতেয় হয়েই মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। অতীতের অভিজাত, মধ্যবিত্তদের নয়া সমাজে বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেওয়া হত না। তবে আরও অনেকের মত শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়নি, যদিও বহু ভূতপূর্ব মধ্যবিত্ত শিশুকে সর্বহারার রাস্ট্র প্রাথমিক শিক্ষার পর আর জ্ঞানচর্চাই করতে দেয়নি। যা হোক, নিজের পেটি বুর্জোয়া অতীত ঝেড়ে ফেলে ছাত্রাবস্থাতেই সলঝিনিতসিন মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী হয়ে ওঠেন, স্কুলের সেরা ছাত্র, কমসমলের(সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির যুব সংগঠন)  সদস্য,পার্টীর অনুগত সর্বহারার নেতা কর্মীদের ছেলে মেয়েদের মত পোষাক না পেলেও, টেনিস খেলবার সুযোগ না পেলেও একটা  সাইকেল উপহার পেয়েছিলেন, যা নিয়ে বন্ধুদের সাথে বেড়িয়ে পড়েন দেশের পিতা স্তালিনের জন্মস্থান দর্শনে।

গণিত নিয়ে কলেজে ভরতি হলেও তাঁর স্বপ্ন ছিল রুশ বিপ্লব নিয়ে মহান এক উপন্যাস রচনা, আর তার জন্যে সমান্তরাল ভর্তি হয়ে গেলেন মার্ক্সবাদ শেখার উচ্চতর কোর্সে। প্রেমে পড়লেন সহপাঠিনীর, ভাল স্কলারশিপের জোরে বিয়েও করে ফেললেন তাকে। রুশ রাস্ট্রের পুলিশ, অগণন বন্দী, হত্যাকান্ড তার চোখে পড়লেও মনে স্থান পায়নি তখনও।

স্তালিনের হঠকারী পররাস্ট্রনীতির জেরে থার্ড রাইখ আক্রমণ করল রাশিয়া। রুশ জাতীয়তাবোধে আর পৃথিবীর একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীতে নাম লেখালেন সলঝিনিতসিন, প্রথমে বাতিল হয়ে গেলেও শেষ পর্যায়ে ডাক পড়ল তাঁরও। সাহসিকতার জন্যে দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কারের জন্য মনোনীতও হলেন।

কিন্ত এর মাঝে নানা কিছু ঘটে গেছে। তার চোখে পড়েছে বিপ্লবী রুশ বাহিনীর বর্বরতা, যার সাথে নাৎসিদের কোন তফাৎ নেই, দেখেছেন নাৎসি বাহিনীর হয়ে লড়ছে রুশ মানুষ, যা তার কাছে অবিশ্বাস্য, দেখলেন দখল হওয়া গ্রামে জার্মান বা পোলিশ নারীদের তার প্রিয় লাল ফৌজ কি নৃশংস ভাবে গণধর্ষণ করছে। যুদ্ধের এই বাস্তবতা ম্যাক্স ফরবারবক পরিচালিত ‘আ উয়োম্যান ইন বার্লিন’ সিনেমায় আমরা দেখেছি। এই ধর্ষণ নিয়ে স্তালিনের বিখ্যাত মন্তব্য, ‘এমন হয়েই থাকে’, আমরা জানি, কিন্ত সলঝিনিতসিনের এসব মেনে নেবার মানসিক জোর ছিল না। বন্ধুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন তার বিরক্তি আর আপত্তি। সেন্সর করা চিঠি ফাঁস হয়ে গেল, সলঝিনিতসিন বন্দী হলেন। কুখ্যাত ধারা ৫৮ তে তাকে যেতে হল আট বছরের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রম শিবিরে। কিছুদিন বিশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রেও ছিলেন। সম্ভবত খুব কঠিন শ্রমের সাজা তাকে ভুগতে হয়নি, যা আরও অনেককে হয়েছিল। কিন্ত প্রায় বিনা কারণে আর বিনাবিচারে আট বছর শ্রমশিবির আর তারপরেও তিন বছর কাজাকস্তানে নির্বাসন তার রুশ বিপ্লবের চরিত্র, স্তালিন, এমনকি লেনিন সম্পর্কে সব ধারণা বদলে দেয়।

বিয়ের দিন সলঝিনিতসিন তার প্রেমিকা-স্ত্রীকে নিজের একটা ছবি উপহার দিয়েছিলেন, তার পেছনে লেখা, যেমনই হোক, সারা জীবন আমায় ভালবাসবে তো? গ্রেপ্তার হবার পর  ছমাসে একবার স্ত্রীকে চিঠি দেবার অধিকার ছিল তাঁর। লুবিয়াঙ্কাতে থাকার সময়  স্ত্রী নাতালিয়া তাঁকে দেখার জন্যে ওই ভয়ানক বাড়ির পাশের পার্কে দাঁড়িয়েও থাকতেন ঘন্টার পর ঘণ্টা। যুদ্ধের চার বছর, অদ্ভুত গ্রেপ্তার, শ্রম শিবির যতই সলঝিনিতসিনকে বদলে দিতে থাকে, ততই নাতালিয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে শুরু করে, একজন রাজনৈতিক বন্দী, যে সমাজতন্ত্রের শত্রু, তাঁর স্ত্রীর রুশ সমাজে তো বাঁচারই কোন অধিকার নেই।

autobiography of Natalia

রাস্ট্রের চরিত্র নাতালিয়াকে এক আশ্চর্য শঠতার আশ্রয় নিতে বাধ্য করে, নাতালিয়া একদিকে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেন, ফিরে যান নিজের বিবাহপূর্ব পদবিতে, সেকথা জানান না তাঁর  স্বামীকে, কিন্ত মাস তিনেক পর বিশেষ অনুমতি নিয়ে দেখা করে জানান যে এই বিয়ে না ভাঙলে  তাঁর পক্ষে চাকরি করা সম্ভব নয়। বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে রাজি হওয়া ছাড়া সলঝিনিতসিনের কোন উপায় ছিল না। যদিও নাতালিয়া কথা দিয়ে যান এই বিচ্ছেদ লৌকিক, সলঝিনিতসিন গভীর হতাশায় ডুবে যান এরপর। ওঁদের  চিঠি বিনিময় চলত, কিন্তু দূরত্বের শীতলতা গ্রাস করে তাঁদের  প্রেমকে।

সলঝিনিতসিনের থেকে মুক্ত নাতালিয়া গবেষণা কেন্দ্রে উচ্চতর অধ্যাপিকার পদ পেয়ে যান, তাঁর  সঙ্গীতের অনুষ্ঠান বহু মানুষকে আকৃষ্ট করে, সলঝিনিতসিন আরও দুরের শ্রমশিবিরে বদলি হয়ে যান, দেখা করার সম্ভাবনা থাকে না আর, মুক্ত জীবনে প্রেমের সম্পর্কে দুজনের ফেরার স্বপ্ন ক্ষীণতর হয়ে ওঠে। সলঝিনিতসিনের কারাবাসের সপ্তম বছরে নাতালিয়া এক সহকর্মীর সাথে বিবাহহীন সংসার বাঁধেন।
সলঝিনিতসিনকে একথা তিনি জানাননি, বারবার নাতালিয়াকে  চিঠি লিখে উত্তর পাননি, শেষে  নাতালিয়ার এক মাসির থেকে ‘স্বাধীন ভাবে’ বাঁচার উপদেশ আসে। সলঝিনিতসিন নাতালিয়াকে জানান যে তাঁর সিদ্ধান্তে তিনি খুশি, এছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোন বিকল্প নেই। এ সময় ক্যান্সার ধরা পরে সলঝিনিতসিনের, যদিও বেঁচে যান, কিন্তু তার ভেতর গভীর এক খ্রিস্টিয় চেতনার জন্ম হয়।

স্তালিনের মৃত্যুর পর আরও কয়েক হাজার বন্দীর সাথে সলঝিনিতসিনও মুক্তি পান। এক বন্ধুর বাড়িতে হঠাত্‍  দেখা হয়ে যায় নাতালিয়ার সঙ্গে। আবার প্রেম। সহকর্মীর সংসার ছেড়ে এসে নাতালিয়া আবার ঘর বাঁধেন সলঝিনিতসিনকে নিয়ে। কিন্তু সলঝিনিতসিন তার জীবনের নতুন অর্থ  খুঁজে নিয়েছেন সাহিত্যে, নির্মম স্তালিনবাদ আর রুশ সমাজতন্ত্রকে নগ্ন করে দেখাবার তীব্র বাসনায়, প্রায় ডিসেম্বরিস্ট(রাশিয়ান গুপ্ত সংগঠন যারা যার প্রথম নিকোলাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে)আর নারদনিকদের ( রাশিয়ান বুদ্ধিজীবীদের গোপন সংগঠন যারা জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে) ঐকান্তিকতায়। বাড়িতে বসে লেখেন না, লুকিয়ে, বন্ধুদের ঘরে বসে, এখানে ওখানে ১০/১২/১৪ ঘন্টা কাজ করেন, তথ্য যোগাড় করেন, তার আবাল্যের স্বপ্নের উপন্যাস, রুশ বিপ্লব নিয়ে তার শিল্পকর্ম সম্পূর্ণ করতে।

 

ক্রুশভের বি-স্তালিনিকরনের পর সলঝিনিতসিনের ‘ইভান দেনিসভিচের জীবনের একটি দিন’  উপন্যাসটি প্রকাশ হয়।  সম্মানে, অর্থে সলঝিনিতসিন রুশ সমাজে স্থান করে নেন। কিন্তু ক্রুশভের অপসারণের পর তার আর কোন নাটক, উপন্যাস যে প্রকাশ পাবে এমন আশা ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে আসে। একদিকে নতুন করে রাস্ট্রীয় নিপীড়ন, অন্যদিকে সলঝিনিতসিনের ধর্মীয় দর্শন, রাজনৈতিক দর্শন, নাতালিয়া আবারও অনেক দুরের মানুষ হয়ে উঠেছেন।

Alexander and Natalia Reshetovskaya

একদিন দাম্পত্য কলহের ফাঁকে নাতালিয়া বলেই ফেলেন যে,  শ্রমশিবিরে বন্দী সলঝিনিতসিন তাঁর কাছে  অনেক বেশী আকর্ষিনীয় ছিলেন। এরপর থেকে এক  উন্মাদ সন্দেহের বশে সলঝিনিতসিন নাতালিয়াকে এড়িয়ে চলতে থাকেন, তাঁর সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন তাঁকে। আরেক নারী আসে তাঁর জীবনে, প্রায় জোর করে বিবাহবিচ্ছেদ আদায় করেন সলঝিনিতসিন স্ত্রীর কাছ থেকে।

১৯৭৪এ আবার গ্রেপ্তার হলেন সলঝিনিতসিন,  এবারে আর শ্রমশিবির না, নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে নির্বাসন দেওয়া হয়, দ্বিতীয় স্ত্রী আর সন্তানেরাও ক’দিন পর তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়।

নাতালিয়ার যে আত্মজীবনী(মাই লাইফ উইথ সলঝিনিতসিন) প্রকাশিত হয়, তাতে লেখা হয়  স্তালিনের শ্রমশিবিরের বিষয়ে যা   কিছু সলঝিনিতসিনের লেখায় বলা হয়েছে তা মিথ্যা, উন্মাদের কল্পনা, ব্যক্তিমানুষ সলঝিনিতসিনেরও নিন্দা করা হয় নানা ভাবে।

১৯৯৬, আর লেনিনের ছায়া নেই রুশ দেশের ওপর। অসুস্থ নাতালিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় তার কাগজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়ে একটা বিয়ের কাগজ। কেজিবির এজেন্ট  কনস্তানতাইন সেমিওনভ, সাংবাদিক ও নাতালিয়ার আত্মজীবনীর সম্পাদক আর নাতালিয়ার ১৯৭৪ সালে বিয়ের নথি।

Previous post

হাসব না না না না: প্রসঙ্গ লতা সচিন তন্ময় - শিমূল সেন

Next post

গুলাগ : গল্প নয়, সত্যি - ২ ~ অর্ক সেন

দেশের আগামীকাল

দেশের আগামীকাল

আগামীকাল : লোকাল-গ্লোবাল- ন্যাশানাল এবং বলা বাহুল্য, র‍্যাশনাল। ইন্ডিপেনডেন্ট মেজাজ, অল্টারনেটিভ সাজ। পোস্টমডার্ন ভাব, শান্ত স্বভাব। একবার পড়লে ভাবতে হবে আবার পড়তে এবং ভাবতে হবে । পড়া আর ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে।

1 Comment

  1. Biplab
    June 10, 2016 at 7:36 pm — Reply

    Odbhut ebong proyojoniyo ekti probondho. Boi duto ami porar chesta korbo. Koekdin age Stalin er order no 227 porchilam.

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *